অহী আলম রেজা::
এ শহর ছিন্ন ভিন্ন করে গেছো তুমি তোমার বিহনে মেঘলা রোদের আকাশ ও বসন্ত ও বাতাস কোথায় লুকালে কালো শার্টে শোক মেখে উড়াল পুরুষ উড়ে উড়ে উড়ে উড়ে ভেঙে পড়ে কান্নার অতলে...
কাঁদছে সুনামগঞ্জ, প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে আজও কাঁদছে সুনামগঞ্জের মানুষ। কাঁদছে শত শত তরুণ-তরুণী। জল-জ্যোৎস্নার শহরে জ্যোস্নার আছড়ে পড়ছে, তবুও কেউ দেখছে না। বাসার ছাদে বসছে না জ্যোৎস্না দেখার প্রতিযোগিতা। পাড়ায় পাড়ায় বসে না ফকির মেলা। পৌর মার্কেট ঘিরে বসে না সাহিত্য আড্ডা। কবিতার শহরে আজ কবি নেই।
কবি মমিনুল মউজদীন ছিলেন সত্তর দশকের রোমান্টিক কবি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও তাঁর চিন্তা-চেতনা কখনো পুঁজিবাদী হাঙরের রূপধারণ করেনি। সামন্ত আভিজাত্যবোধের দেয়াল ডিঙিয়ে উদার মানবতাবাদী রাগের তাল দিয়েছেন বারবার। তাঁর রোমান্টিক চিন্তার সাথে আধুনিক বাংলার চিরন্তন স্পন্দন পাওয়া যেতো। উপলব্ধি করা যেতো পঞ্চাশ কিংবা ষাটের দশকের কবিদের মতো সংক্ষোভ প্রতিবাদ, আত্ম আবিষ্কার কিংবা আত্মমুক্তির প্রয়াসে পলায়নপরতা। সুনামগঞ্জবাসী মমিনুল মউজদীনকে আবিষ্কার করেছিল বিভিন্নভাবে। তিনি কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো সমাজসেবী আবার কখনো রোমান্টিক কবি। যেকোন সমস্যায় মানুষকে নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, অধিকার আদায় করেছেন। তিনি তরুণদের মানুষের জন্য কাজ করার প্রেরণা দিতেন।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি স্ত্রী-পুত্রসহ এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। গুরুতর আহত বড় ছেলে ফিদেল নাহিয়ান সুস্থ হয়ে এখন বাবার একমাত্র উত্তরাধিকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কবি মমিনুল মউজদীনের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি ছিল হৃদয়ের টান। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ‘এ শহর ছেড়ে পালাবো কোথায়’ নামে কাব্য প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর পর ‘হৃদয় ভাঙার শব্দ’ নামে আরেকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া গ্রামে ১৯৫৫ সালের ২৯ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৯ ভাই, ৫ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। মা ছিলেন সৈয়দা শামসুন্নাহার খাতুন। বাবা দেওয়ান রাজা চৌধুরী ছিলেন মরমী সাধক হাছন রাজার পৌত্র। অত্যন্ত মেধাবী মমিনুল মউজদীন ছাত্রজীবন থেকে ছিলেন রাজনীতি সচেতন। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হন। মিছিলে মিছিলে দেখে ফিরেন শহরে অলিগলি। ১৯৭৪ সালে যোগ দেন জাসদ ছাত্রলীগে। সুনামগঞ্জে তিনি ‘তরুণ সাহিত্যসেবী’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তখন তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে স্বৈরাচারবিরোধী কবিতা। কাব্যচর্চা আর সাংস্কৃতিক কর্মকা- নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মমিনুল মউজদীন। মরমী কবি হাছন রাজাকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন মউজদীন। হাছন লোক উৎসবের মাধ্যমে তিনি এর ব্যাপ্তি ছড়ান।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও মমিনুল মউজদীন ছিলেন বেশ সরব। ১৯৯৩ সালে পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি। জ্যোৎ¯œার কবি মমিনুল মউজদীন নেই। তিনি আজ লোকান্তরে। তিনি থাকবেন আমাদের স্মৃতি-সত্তায়। নিয়ন আলো ভেদ করে সুনামগঞ্জবাসী যে আলো দেখবেন, সেই জ্যোৎস্নায় ভেসে বেড়াবেন কবি মমিনুল মউজদীন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
জ্যোৎস্নার শহরে ‘হৃদয় ভাঙার শব্দ’
- আপলোড সময় : ১৬-১১-২০২৫ ০৯:১৩:১৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-১১-২০২৫ ০৯:২৯:৪৭ পূর্বাহ্ন
ছবি: প্রয়াত পৌর চেয়ারম্যান, কবি মমিনুল মউজদীন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক